141862.jpg

লাজনা ইমাইল্লাহ কিভাবে গঠিত হল

বাংলাদেশে লাজনা ইমাইল্লাহর ইতিহাস ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

লাজনা ইমাইল্লাহ সংগঠনটি একটি আন্তর্জাতিক মহিলা সংগঠন। ১৯২২ সালের ২৫শে ডিসেম্বর আহমদী জামাতের দ্বিতীয় খলীফা হযরত মুসলেহ মাওউদ (রা.) আহমদী জামাতের মহিলাদের জন্য এই সংগঠনটি কাদিয়ানে প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে এটি শুধু কাদিয়ানে সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯২৩ সালে এটিকে আন্তর্জাতিক রূপ দেয়া হয়।

এই সংগঠনের প্রথম সদর ছিলেন উম্মে নাছের সাহেবা। অর্থাৎ হযরত খলীফাতুল মসীহ্‌ সালেসের(রহ.)মাতা। এরপর সদর সভানেত্রী হন উম্মে তাহের সাহেবা। অর্থাৎ হযরত খলীফাতুল মসীহ্‌ রাবে(আই.)এর মাতা। এরপর সদরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন মরিয়ম সিদ্দীকা সাহেবা। উল্লেখ্য যে, এই তিনজনই ছিলেন হযরত মুসলেহ মাওউদ (রা.) এর সহধর্মিনী। আহমদী জামাতের চতুর্থ খলীফা ১৯৮৯ সালে এই সংগঠনের আন্তর্জাতিক একক নেত্রীত্ব রদ করে প্রত্যেক দেশে ন্যাশনাল বা জাতীয় সদরের প্রবর্তন করেন!

 

লাজনা ইমাইল্লাহ গঠনের উদ্দেশ্যঃ 

'লাজনা শব্দটি আরবী। এর অর্থ হল দল বা সংগঠন আর 'ইমাইল্লাহ' শব্দের অর্থ আল্লাহর সেবিকা বা দাসীবৃন্দ। সুতরাং লাজনা ইমাইল্লাহর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্‌র দাসীবৃন্দের সংগঠন। আমরা জানি আল্লাহ্‌ তাআলা কারো মুখাপেক্ষী নন। অতএব তাঁর কোন সেবিকার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ্‌র সেবিকা অর্থ আল্লাহ্‌র সৃষ্ট জীবের সেবা করে যে। এই নামকরণ থেকে এও বোঝা যায় যে- লাজনার সদস্যরা পুরুষের দাসী নয়, বরং আল্লাহ্‌র দাসী। পুরুষেরা আল্লাহ্‌র দাস। তেমনি নারীরাও আল্লাহ্‌র দাসী। এইদিক দিয়ে কেউ কারো ছোটও নয়। কেউ কারো বড়ও নয়। উভয়েই আল্লাহ্‌র দৃষ্টিতে সমান।

পবিত্র কুরআন করীমে আল্লাহ্‌তাআলা বলেন-

ওয়ামাই ইয়ামাল মিনাস্‌ সালেহাতি মিন্‌ জাকারিনা আওউনছাহ

-অর্থাৎ সতকর্মে বা পুণ্যকর্মে নর ও নারী সমান।

লাজনা ইমাইল্লাহর প্রধান উদ্দেশ্য হল আল্লাহ্‌র প্রকৃত দাসী বা সেবিকা সৃষ্টি করা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

আমি মানুষ এবং জিনকে শুধুমাত্র আমার ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছি।

মানুষ সৃষ্টির এই মহান উদ্দেশ্য যা স্রষ্টা নিজেই পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন-এই উদ্দেশ্যকে সমানে রেখে মহিলারা যেন জীবন যাপন করতে পারেন এবং নিজ পরিবার অর্থাৎ স্বামী, সন্তান ও অন্যান্য আত্মীয় পরিজনদেরকে প্রকৃত বান্দা হওয়ার জন্য প্রেরণা সৃষ্টি করতে পারেন- এটাই লাজনা ইমাইল্লাহ কায়েমের মূল উদ্দেশ্য। 

পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই হচ্ছে নারী। অতএব কোন সাফল্য বা অগ্রগতির জন্য শুধুমাত্র পুরুষের একক প্রচেষ্টা কখনই ফলপ্রসূ হতে পারে না। এজন্য মহিলাদের নিয়ে প্রতিটি কাজ করা অবশ্য কর্তব্য। আর এই সত্যটি উপলব্ধি করেছিলেন হযরত খলীফাতুল মসীহ সানী আল মুসলেহ মাওউদ (রা.)।

তিনি বলেছেন-

তোমরা যদি শতকরা পঞ্চাশ ভাগ মহিলাদের সংশোধন সুসম্পন্ন করতে সক্ষম হও, তাহলে ইসলামের প্রতিশ্রুত বিজয় এসে যাবে।

আর একারণেই তিনি বিশ্বব্যাপী তবলীগের সফলতার জন্য মহিলাদের নিয়ে পৃথক সংগঠন কায়েম করেন। যেন আহমদী মহিলারা অন্যান্য মহিলাদের কাছে তবলীগ করতে পারেন। 

এই কাজে সফলতা লাভ করার জন্য চাই নিয়মিত নামাজ, নফল ইবাদত, দোয়া, কুরআন ও হাদীস শিক্ষা, বর্তমান যুগের ইমাম হযরত মসীহ মাওউদ (আঃ) এর শিক্ষা ও অমৃতবাণীর আলোকে পথ চলা, বর্তমান খলীফা সাহেবের (আইঃ) আদেশ নির্দেশ মেনে নিজেকে আহমদীয়াত তথা ইসলামের জন্য জান-মাল, সময় ও সন্তান-সন্ততিকে কুরবানী করতে সদা প্রস্তুত রাখা এবং হযরত রসূলে করীম (সা.)-এর পবিত্র ও মহান আদর্শের উপর কায়েম থেকে মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে সাফল্যমন্ডিত করা।

আহমদী জামাতের এই মহিলা সংগঠনটি বর্তমানে ২০২টি দেশে প্রতিষ্ঠিত। এই সংগঠন একক প্রচেষ্টায় লন্ডন, হেগ, জার্মানী এবং কোপেনহেগেনে মসজিদ নির্মাণ করেছে। ১৯৪৫ সালে অল্পবয়স্ক বালিকাদের সংগঠন 'নাসেরাত' নামে পৃথক সঙ্গঠন করে দেয়া হয়। তবে এটিও লাজনার নিয়ন্ত্রণাধীন।

লাজনা ইমাইল্লাহর প্রথম মুখপত্র মিসবাহ ১৯২৬ সাল কাদিয়ান থেকে প্রকাশিত হয়। বর্তমানে বিভিন্ন দেশ থেকে আরো বহুপত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। বাংলাদেশে লাজনা ইমাইল্লাহর ত্রৈমাসিক পত্রিকা লাজনা বুলেটিন ১৯৯৯ সাল থেকে প্রকাশিত হচ্ছে । আহমদী জামাতের মহিলারা তাদের এই নিজস্ব সংগঠনের মাধ্যমে জামাতের উন্নয়নের পথে কাজ করে যাচ্ছে।

আহমদীয়া জামাত কুরআনে প্রদত্ত ইসলামের রূপরেখায় প্রতিষ্ঠিত একমাত্র জামাত। আদম (আ.)-এর মাধ্যমে যে খেলাফত পদ্ধতির প্রচলন হয় হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে তা পূর্ণতা লাভ করে। ইমাম মাহ্‌দী (আ.) হলেন হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শেষ খলীফা। ইমাম মাহদী (আ.) এর পর থেকে যে খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা হল ইমাম মাহদী (আ.) এর খেলাফত। এক কথায় আল্লাহর খলীফা হলেন খলীফাতুর রসূল। ইমাম মাহদী (আ.) একধারে আল্লাহর খলীফা, একাধারে রসূলের খলীফা। তাঁর খলীফারা হলেন খলীফাতুল মসীহ। এই খলীফাতুল মসীহদের একজন খলীফা সানী (রা.) এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা । অতএব অন্যান্য সংগঠন থেকে এই সংগঠনের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদেরকে এই গুরুতৃপূর্ণ বিষয়ের মর্যাদা দিয়ে কাজ করে যেতে হবে।