Image by Yasmine Arfaoui

তবলীগের গুরুত্ব

তবলীগ শব্দের অর্থ হলো প্রচার করা। সাধারণভাবে দ্বীন প্রচার করাকে তবলীগ বলে এবং যিনি দ্বীন প্রচার করেন অর্থাৎ তবলীগের কাজ করেন তাকে মুবাল্লিগ বা দ্বীন প্রচারক বলে।

একজন তববলীগকারী বা আল্লাহর দিকে আহবানকারী  (দাঈয়ানে ইলাল্লাহ) কিভাবে নিজেকে প্রস্তুত করে পবিত্র মহান দায়িত্ব পালন করবেন অর্থাৎ মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান জানাবেন তা অবশ্যই জানা প্রয়োজন।

মুসলমানরা বিশ্বাস করেন ইসলাম আল্লাহর মনোনীত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা । সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে ইসলামের বাণী  পৌঁছে দেওয়ার জন্য আল্লাহ পৃথিবীতে অসংখ্য নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর শেষ বাণীবাহক। তাই মুসলমানদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার দায়িত্বটি দিয়ে যান।

তবে এ বিষয়ে মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ কুরআনের সূরা আল ইমরানের ১১০ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, " "তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত মানুষের কল্যাণের জন্য তোমাদেরকে বের করা হয়েছে । তোমরা মানুষকে সৎ কাজে আদেশ করবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে"।

তাবলীগের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে একজন তবলীগ কারীকে (দাঈয়ানে ইলাল্লাহ) কে সর্বদা কোরআনের যে আদেশটি কে স্মরণ রাখতে হবে তা হলোঃ

সূরা হামীম সাজদা আয়াত (৩৫ - ৩৬) আল্লাহ তা'আলার বলেছেন," ভাল এবং মন্দ একরকম হতে পারে না । তাই মন্দকে বিতাড়িত  করো উত্তম দ্বারা। তখন দেখবে যার সঙ্গে তোমার শত্রুতা ছিল সে ব্যক্তি এবং তোমার মধ্যে অতি উত্তম বন্ধুসুলভ সম্পর্কের সৃষ্টি হয়েছে । কিন্তু এই মর্যাদা ঐ সকল ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কাকেও দেওয়া হয় না । যারা ধৈর্যশীল এবং যারা উত্তম গুণাবলীর অধিকারী ।"

 

তবলীগকারী বা আল্লাহর দিকে আহবানকারী কে আল্লাহ তায়ালা সূরা নাহল ১২৫ নং আয়াতে বলেছেন, " আপনি আপনার প্রতিপালকের দিকে আহবান করুন হিকমত ও প্রজ্ঞা দ্বারা এবং সুন্দর উপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে উৎকৃষ্টতর পদ্ধতিতে আলোচনা-বিতর্ক করুন।"

 

তাছাড়া আল্লাহতালা সূরা হা মীম আস-সাজদা ৩৪ নং আয়াতে বলেছেন, “এবং ওই ব্যক্তি অপেক্ষা কথায় কে অধিক উত্তম যে লোকদিগকে আল্লাহর দিকে আহবান করে এবং সৎকর্ম করে এবং বলে নিশ্চয়ই আমি আত্মসমর্পণকারীগণের অন্তর্গত”।

 

উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের নির্দেশ দান করেছেন যে, উম্মতের মধ্যে একটি জামাত বিশেষভাবে এই কাজের জন্য থাকিতে হইবে যাহারা ইসলামের দিকে লোকদিগকে তবলীগ করা তথা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ এর কথা বলেছেন।

 

মানুষের ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার ক্ষেত্রে খুব সহজেই অহংকার বা কমতির প্রকাশ পায় কিন্তু একজন মানুষ যখন আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকে তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর সেই অহংকার বা কমতি দূর করে দেন এবং তখনই একজন মানুষ প্রকৃতিগতভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সে  মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান করতে পারে।

অতএব তবলীগকারীকে মিষ্টভাষী , সৎকর্মপরায়ন এবং খোদাভীরু (মুত্তাকী ) হওয়া আবশ্যক।

 

 পবিত্র কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ীঃ

সূরা আলে ইমরান ২০ নং আয়াতে আল্লাহতালা বলেছেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট ইসলামই একমাত্র মনোনীত ধর্ম  বা জীবন ব্যবস্থা।"

সূরা আলে ইমরান ১০৫ নং আয়াতে আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নির্দেশ দান করেছেন যে , " আর তোমাদের মধ্যে এমন একদল থাকা দরকার যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বারণ করবে। আর এরাই সফল হবে।"

সূরা আলে ইমরানে ১১১ নং আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত যাদের মানবজাতির কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।"

 

অতএব মানব জাতিকে কল্যাণের ভাগী করতে হলে তবলীগ করতে হবে।

উপরোক্ত আয়াত  এর মাধ্যমে আল্লাহ পাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের নির্দেশ দান করেছেন যে, উম্মতের মধ্যে একটি দল বা জামাত বিশেষভাবে এই কাজের জন্য থাকিতে হইবে যাহারা ইসলামের দিকে লোকদিগকে আহ্বান করবে বা তবলীগ করবে। তবলীগ করা তথা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের কথা বলেছেন। অতএব মানবজাতিকে কল্যাণের ভাগী করতে হলে তবলীগ অপরিহার্য। এর বিকল্প নেই। আর যারা কল্যাণের ভাগী  হয় তাদের দায়িত্ব হলো অন্যকে তা পৌঁছে দেওয়া।

পবিত্র কোরআনের সঠিক জ্ঞান অর্জন করে স্বজাতিকে তা পৌঁছে দেওয়া আমাদের কর্তব্য। আমরা লেখাপড়া জানি না, আমরা জ্ঞানী আলেম নই, এই ভয় না করে আমরা যা জেনেছি, যা - ই আয়ত্ত করেছি তা- ই সবাইকে পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।

সূরা ইউনুস এর ২৭ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন ,

" যারা উত্তম কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে সর্বোত্তম প্রতিদান । আর কালিমা ও লাঞ্ছনা তাদের চেহারাকে কখনো আচ্ছন্ন করবে না ‌।এরাই জান্নাতবাসি সেখানে এরা চিরকাল অবস্থান করবে।" এ আয়াতে তাবলীগ কারীদেরকে বেহেশতের সুখবর দেওয়া হয়েছে।

সূরা মায়েদার ৬৮নং আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন , "হে রাসূল ! তোমার প্রভু প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা (মানুষের কাছে ভালোভাবে) পৌঁছে দাও আর তুমি তা না করলে তুমি যেন তাঁর বাণী পৌঁছানোর দায়িত্বই পালন করলে না ।আর আল্লাহ তোমাকে মানুষের (কবল থেকে রক্ষা করবেন) নিশ্চয়ই আল্লাহ অস্বীকারকারীদের হেদায়েত দেন না।

নবী করীম (সা.) আল্লাহতালার বানী প্রচার করতে কখনো কোন কুন্ঠা বা আলস্য  দেখিয়েছেন, এ বাক্যটি একথা ইঙ্গিত করে না। তিনি তো এ কাজেই দিনরাত মশগুল থাকতেন, অতএব বাক্যটি একটি সাধারণ নীতিমাত্রা বর্ণনা করছে, যে ব্যক্তি একটি বিশেষ বাণী বাহক রূপে প্রেরিত হয় সে যদি বাণীটির সবটা না পৌঁছায় এবং কোন অংশ পৌঁছাতে ভূলে যায় তাহলে সে প্রকৃত বাণী বাহকই  হতে পারে না।

এ আয়াতের শেষের অংশটি, আল্লাহ তোমাকে মানুষের কবল থেকে রক্ষা করবেন কারণ এখানেই   এই নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে যে, আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকলে যে সমস্ত বিপদ আপদ আসবে সেগুলো থেকে আহবানকারী নিরাপদ থাকবে।

 

হযরত মুহাম্মদ (সা.) তবলীগ করার গুরুত্ব সম্পর্কে যা বলেছেনঃ

বুখারী শরীফের একটি হাদীসে উল্লেখ আছে যে, মহানবী (সা.) তবলিগের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করতে গিয়ে হযরত আলী (রাঃ) কে যে নসীহত করেছেন । সেটি আমাদের জন্য এক স্বর্ণময় উপদেশ। তিনি (সা.) হযরত আলী (রাঃ) কে সম্বোধন করে একবার বলেন, খোদার কসম! তোমার মাধ্যমে এক ব্যক্তির হেদায়েত পাওয়া তোমার জন্য এটা এমন এক  প্রাপ্তি, যা এক অতি মূল্যবান লাল উট অপেক্ষা উত্তম। সেই যুগে লাল উটকে খুবই মূল্যবান প্রাণী মনে করা হতো। তিনি (সা.) বলেন, জাগতিক ধন-সম্পদের অর্থাৎ কারো হেদায়েত লাভের মোকাবিলায় কোন গুরুত্বই রাখেনা।

হযরত আবু হুরায়রা(রা.) বর্ণনা করেন যে, মহানবী (সা.) আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন নেক কর্ম এবং হেদায়াতের দিকে ডাকে সে ততোটাই পুণ্যের ভাগী হয় যতটা পুন্য তার উপর আমল কারী ব্যক্তি লাভ করে আর সেই ব্যক্তির পুণ্যের কোনো ঘাটতি হয় না। (মুসলিম)

 

হযরত মসীহ মাওউদ (আ.):

প্রতিশ্রুত মসিহ (আ.) তাঁর রচিত 'কিশতিয়ে নূহ' পুস্তকে বলেছেন, সেই ব্যক্তি, যে ধর্মকে পার্থিব  বিষয়ের উপর স্থান দেয় না, সে আমার জামাত ভুক্ত নয়।'

ধর্মকে পার্থিব বিষয়ের ওপরে স্থান দেয়া আসলে খুবই কঠিন এক কাজ । তবে মহিমান্বিত হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে ধর্মকে পার্থিব  বিষয়ের উপর স্থান দেয়, কারণ এমন লোককে খোদাও অন্যদের ওপর স্থান দান করেন। (মালফুযাত)

তবলীগ সম্পর্কে আমাদের ইমাম মাহাদী (আ.) দাওয়াত ইলাল্লাহর  জোশ ও উদ্দীপনা এভাবে ব্যক্ত করেছেন,  আমার সাধ্য থাকলে আমি ভিখারীর ন্যায় মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে খোদাতালার সত্য ধর্ম প্রচার করতাম ।এবং বিস্তৃত ইমান বিনাশকারী শিরক ও কুফুরী থেকে  মানুষকে বাঁচাতে তবলীগ ও প্রচার এর মধ্যে জীবন কাটিয়ে দেই, যদি ও এই পথে আমি নিহত হই না কেন । " (মালফুযাত তৃতীয় খণ্ড পৃষ্ঠা ৩৯১)

হযরত মসীহ মাওউদ (আ.) এর এক সাহাবী হযরত গোলাম রসুল রাজেকি (রা.) অন্য এক সাহাবীকে স্বপ্ন দেখেন (যিনি কিছুদিন পূর্বে ই মারা গেছেন) এবং  স্বপ্নে প্রশ্ন করেন আপনার কি হিসাব হলো? উত্তরে তিনি যা বললেন, তা হলো আমি একজন আহমদী হিসেবে আমার আবার কি হিসাব হবে। আমাকে দুটো প্রশ্ন করা হলো ,

প্রথমটি হলো তুমি চাঁদা দিয়েছে কিনা?

দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো  তবলীগ করেছো কিনা ?

উক্ত স্বপ্ন থেকে আমরা বুঝতে পারলাম একজন আহমদী সদস্যদের তবলীগ করার গুরুত্ব কতটুকু।

প্রতিশ্রুত মসিহ  (আ.) বলেন , একজন মুমিনের উচিত তবলীগে যথাযথ শিষ্টাচার প্রদর্শন করা। প্রয়োজন যখন কোমলতার, কঠোরতা প্রদর্শন করা তখন বিজ্ঞজনোচিত নয় । একইভাবে যেখানে কঠোরতা প্রদর্শন করা দরকার , সেখানে কোমলতা প্রদর্শন করা অন্যায়। ফেরাউন ছিল এক কঠোর  দাম্ভিক প্রকৃতির নাস্তিক , কিন্তু হযরত মুসা (আ.) কে তাঁর সাথে কোমল ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল । পবিত্র নবী (সা.) একই ধরনের নির্দেশ পেয়েছিলেন । মুমেনদের মধ্যে কোমলতা মমতাপূর্ণ ভালোবাসা থাকা উচিত। (মালফুযাত)

তবলীগ করার ফলে আমাদের জ্ঞান অর্জন, জ্ঞান বৃদ্ধি , বক্তব্য সুস্পষ্টতা, ধৈর্যশীল, সাহসী এবং মানুষের সাথে সুম্পর্ক সৃষ্টি ও দৃঢ় হয় ।

তবলীগকারীরা আল্লাহতালার সাহায্যে সম্পৃক্ত হন এবং আল্লাহর নিদর্শনসমূহ  প্রত্যক্ষকারী হয়ে যান। আল্লাহতালার ভালোবাসা সন্তুষ্টি লাভ দাওয়াত ইলাল্লাহ এর মাধ্যমে সম্ভব । বিশ্বে ইসলামকে বিজয়ী করতে তবলীগের গুরুত্ব অপরিসীম ।