কেন্দ্রীয় তালীম ও তরবিয়তি ক্লাস ২০২২

খেলাফতের কল্যাণ

ওয়াদাল্লাহুল্লাযিনা আমানু মিনকুম ওয়া আমিলুসসালিহাতি লা ইয়াসতাখলিফান্নাহুম ফিল আরদি কামাসতাখলাফাল্লাযিনা মিন কাবলিহিম ওয়ালা ইউমাক্কিনান্না লাহুম দিনাহুমুল্লাযিরতাদা লাহুম ওয়ালা ইউ বাদ্দি লান্নাহুমম্মিন বা’দি খাউফিহিম আমনা;;ইয়া’বুদু নানি লা ইউশরিকুনা বিশাইয়া;; ওয়ামান কাফারা বা’দা যালিকা ফাউলায়িকা হুমুল ফাসিকুন।

অর্থঃ তোমাদের মাঝে যারা ইমান আনে এবং সৎকাজ করে আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি অবশ্যই পৃথিবীতে তাদের খলিফা বানাবেন যেভাবে তিনি তাদের পূর্ববর্তীদের মাঝে খলিফা বানিয়েছেন। আর অবশ্যই তিনি তাদের  ধর্মকে সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয় ভীতির অবস্থার পর অবশ্যই তিনি তা নিরাপত্তায় বদলে দিবেন। তারা আমার ইবাদত করবে, আমার সাথে কাউকে শরীক সাব্যস্ত করবে না। আর এরপর যারা অকৃতজ্ঞতা করবে তারাই দুষ্কৃতকারী। (সুরা নুর- ৫৬)     

 

১) খেলাফত এমন মাধ্যম যেখানে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপিত হয়ঃ

খেলাফত- হাবলুল্লাহ- আল্লাহর রজ্জু। যা আমাদেরকে খোদা তায়ালার সাথে সম্পর্কযুক্ত করে রাখে। যার ছায়া আমাদের সব ধরনের অশান্তি, নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা থেকে নিরাপদ রাখে, এবং আমাদের নির্ভীক করে তুলে। খলিফা প্রকৃত অর্থে রসুলের জিল্লি বা ছায়া স্বরুপ হয়ে থাকেন। আল্লাহ তায়ালা চেয়েছেন রসুলের পবিত্র সত্তা যেন কেয়ামত পর্যন্ত ছায়ার আকারে মানুষের মধ্যে থেকে যায়, এবং মানুষ যেন নবুয়াতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত না থাকে।

আল্লাহ তায়ালা দুই প্রকার কুদরত প্রদর্শন করেন, প্রথমত নবির হাত দিয়ে, দ্বিতীয়ত নবির মৃত্যুর পর তার খেলাফতের হাত দিয়ে।

২) এক নজরে খোলাফায়ে রাশেদাঃ খোলাফায়ে রাশেদার খেলাফতকাল মাত্র ৩০ বছর ছিল। এর কল্যাণে এই অল্প সময়ে ইসলামের মাঝে অসাধারান উন্নতি ও বিজয় সাধিত হয়েছিল। চারদিকের বিশ্রিংখলা, বিদ্রোহ, দমন, মদিনা রাষ্ট্র এর সুরক্ষা বিধান, কুরআন সংরক্ষন, মুল পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত, একাধিক পাণ্ডুলিপি তৈরি এবং সেগুলোকে বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে দেওয়া, ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো, নতুন মসজিদ নির্মাণ এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাসহ অনেক অনেক কাজ করে গেছেন খোলাফায়ে রাশেদা।

সংক্ষিপ্ত পরিসরে যদি আমরা ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রাঃ) এর খেলাফতের দিকে তাকাই তাহলে বিরুদ্ধবাদিগনের বিরোধিতা আর অস্বীকৃতি তো ছিলই, নব খেলাফতকে ধ্বংস করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল এবং যাকাত প্রদানেও ছিল তাদের অস্বীকৃতি। কিন্তু তা সত্তেও অতি বিচক্ষনতার সাথে ঐশী সাহায্যের সাথে তিনি সফলতা লাভ করেছিলেন।

হযরত উমর (রাঃ) এর খেলাফত কালেও ছিল অনেক বিরোধিতা তবু তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে গেছেন। যেমনঃ ক) মজলিসে শুরা প্রতিষ্ঠা , খ) অর্থ বিভাগ প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি ।

ন্যায় বিচারের একটি ছোট উদাহরন দেই, হযরত উমর (রাঃ) এর খেলাফত কালে তিনি কোন অঞ্চলের গভর্নর নিযুক্ত করতে যাচ্ছিলেন, সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, নিয়োগপত্র লিখছিলেন। এমন সময় উনার কোলে এক শিশু এসে বসায় তিনি তাকে আদর করছিলেন। যিনি গভর্নর হবেন তিনি বললেন, আমার দশজন ছেলেমেয়ে কিন্তু তারা ভয়ে কখনো আমার কাছে আসে না। এ কথা শুনে উমর (রাঃ) নিয়োগপত্র ছিঁড়ে ফেলেন। বললেন, তোমার মত মানুষকে গভর্নর নিযুক্ত করা যায় না। যে ব্যক্তি শিশুদের আদর করেনা ,সে ঐ অঞ্চলের মানুষদের প্রতি কি সদয় হবে। এমনি ন্যায় বিচার করতে দেখি ঐশী খলীফাগণকে।

হযরত উসমান (রাঃ) এর তত্ত্বাবধানে কুরআন সংকলন, প্রচার এবং প্রসার, ও বিভিন্ন রাজ্য জয় করে ইসলামের মানকে সমুন্নত রাখেন। আবার হযরত আলি (রাঃ)ও আল্লাহর সন্তুষ্টিকে এতটাই প্রাধান্য দিতেন যে, একবার যুদ্ধের ময়দানে এক কাফেরকে হত্যা করতে উদ্যত হন তখন ঐ কাফের তাঁর মুখে থুথু মেরে দেয় তখন তিনি তাকে ছেড়ে দেন। জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এতক্ষন আল্লাহর জন্য যুদ্ধ করছিলাম, যখন তুমি থুথু দিলে তখন আমার রাগ এসে যায়। নিজের নফসের ইচ্ছা যেন এখানে শামিল না হয় তাই তোমাকে ছেড়ে দিলাম। এ কথা শুনে ঐ কাফের মুসলমান হয়ে যায়।

৩) রসুল (সাঃ) এর কাজের বিশ্লেষণ ও খেলাফতের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নঃ

ক) আল্লাহর আয়াত পড়ে মানুষকে শুনানো তথা তবলিগের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করা।

খ) কুরআনের তালিম দেওয়া।

গ) হিকমত শেখানো – নামাজ শেখানো এবং তা মানুষকে বুঝিয়ে বলা।

ঘ) “ ওয়া ইউ যাক্কিহিম” তাদের পাক পবিত্র করা, আত্মশুদ্ধি করা, তরবিয়ত করা।

এই কাজগুলো যেমন নবিরা করে গেছেন, খোলাফায়ে রাশেদাগনরা করে গেছেন, এবং মসীহ মাউদের খলিফাগনরা করে যাচ্ছেন। খলিফা বানানো আল্লাহর কাজ। রসুল (সাঃ) বলেন,” সুম্মা তাকুনু খিলাফাতুন আলা মিনহাজিন নবুওওয়াহ”।

অর্থঃ আবার নবুয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে।

তারই ধারাবাহিকতায় হযরত মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি (আঃ) এর আহমদিয়া মুসলিম জামাত প্রতিষ্ঠিত হয়। আর তার খেলাফতকাল চলছে। আল- ওসিয়ত পুস্তকে যখন বার বার তিনি তার মৃত্যুর সংবাদ দিচ্ছিলেন আর ১৯০৮ সালে তাঁর মৃত্যুর পর জামাতে আহমদিয়া খেলাফত প্রতিষ্ঠা হয়। শুরু হয় আহমদিয়াতের খেলাফতকাল।

৪) ইসলামের প্রচার ও প্রসারঃ শুরুতে আহমদিয়াত শুধুমাত্র ভারতবর্ষে ছিল। কিন্তু খেলাফতের কল্যাণে আজ ২১৬ টি দেশে আহমদিয়াত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ৪০ জন পবিত্র ব্যক্তি গনের ছোট দলটি আহমদিয়া জামাতে দাখিল হয়েছিল তা আজ বেড়ে ২০ কোটি।

ক) মসজিদ নির্মাণঃ কাদিয়ানের সেই ছোট্ট গ্রাম থেকে আজ হাঁটি হাঁটি পা পা করে আহমদি মসজিদ ও মিশন হাউজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার। আলহামদুলিল্লাহ। খ্রিষ্টানরা আজ থেকে ১৩৩ বছর আগে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্ত কায়েম রেখেছিল। শুধুমাত্র ভারতবর্ষেই ২৯ লক্ষ মুসলমান খ্রিষ্টান হয়েছিল। তাই খ্রিষ্টানরা ঘোষণা করে বেরাচ্ছিল যে সমগ্র বিশ্বকে খ্রিষ্টান বানানো এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।

সময় পাল্টেছে। যেখানে মুসলমানরা নিজেদের মসজিদ ছেড়ে দিয়ে নিজেদের প্রান নিয়ে পালাত সেখানে আজ খেলাফতে আহমদিয়ার কল্যাণে ইসলাম তার হারানো গৌরব ফিরে পেয়েছে। অমুসলিম দেশগুলোতে মসজিদ নির্মাণ করে চলেছে। বার্লিন, লন্ডন, কোপেনহেগেন, বরকিনাফাসু, ক্যালিফোর্নিয়া ইত্যাদি দেশ ছাড়াও শুধু জার্মানিতে ৫০ টি মসজিদ স্থাপিত হয়েছে। লন্ডনের বায়তুল ফুতুহ মসজিদে প্রায় ১০ হাজার লোক নামাজ পড়তে পারে। ৭৫০ বছর পূর্বে যে স্পেন থেকে মুসলমানদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল সেখানে আবার আহমদিয়া খেলাফত প্রথম মসজিদ বানিয়েছে।

হযরত মুসলেহ মাউদ (রাঃ) এর তাহরিকে জাদিদ স্কিমের আওতায় সারা বিশ্বে আরও অনেক মসজিদ, মিশন হাউজ, স্কুল, কলেজ, তবলিগ সেন্টার ইত্যাদি তৈরি হচ্ছে। আর ওয়াকফে জাদিদের ফলশ্রুতিতে আমাদের মুরুব্বিগন এই সিলসিলাকে আরও বাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

খ) কুরআনের সেবা ও প্রকাশনাঃ হযরত আবু বকর (রাঃ) এর যুগে বিভিন্ন যুদ্ধে হাজার হাজার কুরআনের হাফেজ শহিদ হন। এই আশংকায় হযরত উওমর (রাঃ) পরামর্শ দেন কুরআন পুস্তক আকারে সংরক্ষনের জন্য। হযরত উসমান (রাঃ) এর আমলেও কুরআনের মূল কপি থেকে অনুলিপি তৈরি করে বিভিন্ন দেশে প্রেরন করেন।

হযরত মির্জা নাসের আহমদ (রাহেঃ) তালিমুল কুরআনের প্রতি গভির দৃষ্টি ছিল। তিনি খুব জোর দিয়ে বারবার বলতেন, কুরআন পড়তে পারেনা বা পড়ে না এমন কেউ যেন না থাকে। খেলাফতের কল্যাণে আহমদিয়া মুসলিম জামাত প্রায় ৭৬ টি ভাষায় কুরআন অনুবাদ করেছে। এছাড়া খলিফাগন আমাদের কুরআনের তফসির, শাব্দিক অর্থ এবং দরসের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। প্রথম খলিফার তফসির হাকায়েকুল ফুরকান, ২য় খলিফার তফসিরে কবির ও সগির, আনওয়ারুল উলুম নামে প্রায় ৪৫০ টি বইয়ের সংকলন আছে। ৪র্থ খলিফার তফসিরে কুরআন, দরসুল কুরআন, বিশ্বশান্তি, Revaluation rationality knowledge and truth আর প্রত্যেক খলিফার জুম্মার খুতবা পবিত্র কুরআনের এক বিস্ময়কর জ্ঞান ভাণ্ডার। এর চেয়ে সমৃদ্ধ এবং যুগ উপযোগী তফসির আর কেউ দেখাতে পারবে না।

গ) তথ্য  প্রযুক্তির মাধ্যমে ইসলাম প্রচারঃ মনে করিয়ে দেই, ১৯৩৩ সালে আহরারি জামাত আহমদিয়াত কে ধ্বংস করার জন্য হুমকি দিয়েছিল তখন মুসলেহ মাউদ (রাঃ) তাদের সতর্ক করে বলেছিলেন, “ আমি দেখতে পাচ্ছি আহরারিদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।” আর সত্যিই তাই হয়েছিল, যেই তাহরিকে জাদিদের কথা আমি শুরুর দিকে বলেছিলাম তার বদৌলতে আজ আমরা বিজয়ের দ্বার প্রান্তে। ৩ টি স্বতন্ত্র চ্যানেল, ৯ টি অডিও চ্যানেল, বহু ভাষায় অনুবাদ কৃত অনুষ্ঠান সহ MTA এর মত স্যাটেলাইট ২৪ ঘণ্টা বিরামহীন ভাবে সারা বিশ্বে খাঁটি ইসলামের বানী প্রচার করে যাচ্ছে। 

১৯৭৪ সালে দেশব্যাপী আহমদি বিরোধী দাঙ্গা এবং ১৯৮৪ সালে জিয়াউল হক পাকিস্তানে আহমদি বিরোধী অর্ডিন্যান্স জারি করে। খলিফাতুল মসীহ রাবে (রাহেঃ) কে ফাঁসির কাস্টে ঝুলানোর উদ্দেশে এই অর্ডিন্যান্স জারি করে। খলিফাকে রক্ষার দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালার, তিনি হিযরত করে লন্ডনে গিয়ে এক নব দিগন্তের সূচনা করেন। এরই মধ্যে জেনারেল জিয়াউল হক প্লেন ক্রাশে মারা যায় যার লাশের টুকরাও কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় নি। বিজয় হয় আরেক ইলহামি বানীর। MTA এর মাধ্যমে আজ সারা বিশ্বের মানুষ এসব জানতে পারছে। এসব বিরোধিতায় তবলিগের রাস্তা প্রসারিত হচ্ছে এবং মানুষ আজ দলে দলে বলতে গেলে গ্রামের পর গ্রাম আহমদিয়াত গ্রহন করছে। আলহামদুলিল্লাহ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রেডিওর মাধ্যমেও তবলিগ করা হচ্ছে। তাছাড়া internet, youtube. tweeter, facebook, skyp এর মাধ্যমেও খেলাফতের কল্যাণে আহমদিরা ইসলামের প্রচারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

ঘ) প্রিন্ট মিডিয়া ঃ আহমদিয়া জামাত প্রায় ১৭ টির বেশি ভাষায় বিভিন্ন দেশে ৭৮ টিরও বেশি পত্রিকা প্রকাশ করছে। এছাড়া প্রত্যেক খলিফা তাদের নিজেদের মূল্যবান বই পুস্তক ছাপিয়ে ইসলামের অনবরত সেবা করে যাচ্ছে।

৫) অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিঃ লাহোরি জামাত বায়তুল মাল থেকে সমস্ত অর্থ নিয়ে যাওয়ার পর মাত্র ১৪ আনা ছিল আর ১৮ হাজার রুপি ঋণের বোঝা। আজ আমাদের ৫ম খলিফার অধীনে বায়তুল মালে হাজার কোটি টাকারও বেশি জমা হচ্ছে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী যদিও বলেছিল, রাবওয়া বাসিরা ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে অলিতে গলিতে ঘুরবে। কিন্তু আজ খেলাফতের কল্যাণে শুধু পাকিস্তানে নয়, বিশ্বের কোথাও আহমদিদের ক্ষুধার্ত দিন কাটাতে হয় না। টাকার অভাবে গরিব ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা বন্ধ হয় না, নুসরাত জাহা স্কিমের আওতায় ৫১০ টি স্কুল কাজ করে যাচ্ছে। গরিব আহমদি মেয়েদের বিবাহের জন্য মরিয়ম শাদি ফান্ড রয়েছে। বিভিন্ন দেশে আমাদের ওয়াকফে জিন্দেগি ও ওয়াকফে নও ডাক্তাররা বিনামুলে গরিবদের সেবা করে যাচ্ছে। কাদিয়ান থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশে আহমদিরা নিজ খরচে হাসপাতাল নির্মাণ করছে। Humanity first খেলাফতের আরেক কল্যাণের নাম। বিভিন্ন দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ, এবং প্রাকৃতিক বিপর্যস্ত মানুষদের পাশে আছে এ প্রতিষ্ঠানটি। তাই তো বলা যায়,

                             কূল মুমিনিন ইসলামি দেহ

                             খলিফা তাহার প্রান

                              খলিফা বিহীন প্রাণহীন দ্বীন

                              নাহিকো তাহার মান।

৬) ইসলামের মান মর্যাদা অক্ষুন্নঃ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর শান ও আদর্শকে ধরে রাখতে আহমদিয়া খেলাফত সদা সোচ্চার। ২য় খলিফার যুগে (সাঃ) কে অবমাননা করে “ রঙ্গিলা রাসুল” নামে একটি প্রবন্ধ লেখা হয়। এর জবাবে তিনি সিরাতুন্নবি (সাঃ) জলসার প্রবর্তন করেন। ৪র্থ খলিফার যুগে সালমান রুশদী স্যাটানিক ভার্সেস নামে এক নোংরা পুস্তক লিখে। এর জবাবে হুযুর জুম্মার খুতবা দেন এবং পুস্তক লিখেন। ২০০৬ সালে পোপ ষোড়শ রসুল (সাঃ) কে কটাক্ষ করেন। এভাবে আর বেশ কয়েকটি জায়গায় রসুল (সাঃ) কে নিয়ে ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ করা হয়। আহমদিরা এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন, সাংবাদিক সম্মেলন করেন, প্রবন্ধ ছাপানো হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে কার্টুনিস্ট বলতে বাধ্য হয়, এমন আলোচনা পূর্বে হলে আমি কার্টুন বানাতাম না। ২০১২ সালে একটি নোংরা সিনেমাও বানানো হয়। তখনও এর তীব্র প্রতিবাদ করা হয়। এবং যুগ খলিফা দরুদের প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে আহমদিদেরকে রসুল (সাঃ) এর আদর্শকে বিশ্ব বাসীর সামনে তুলে ধরার আহবান জানান। আজ আহমদিরাই রসুল (সাঃ) এর শান ও মর্যাদা সবচেয়ে বেশি পালন করে।

৭) দোয়ার ভাণ্ডারঃ খলিফা আমাদের জন্য দোয়ার এক মূর্তমান দোয়ার ভাণ্ডার। খলিফা গনের কাছে দোয়া চাওয়ার যে বিশেষ ফজিলত আছে তা কয়েকটি উদাহরনের মাধ্যমে বলছি, 

ক) চৌধুরি হাকিম দীন বর্ণনা করেন যে, উনার স্ত্রীর ১ম বাচ্চা জন্মের সময় তিনি বেশ কষ্ট পাচ্ছিলেন। তখন রাত ১২ টার সময় খলিফাতুল মসিহ আওয়াল (রাঃ) এর বাসায় গিয়ে সব ঘটনা বলে দোয়ার আবেদন করলে হুযুর একটি খেজুর দোয়া করে উনার হাতে দিয়ে স্ত্রীকে খাওয়াতে বলেন। এবং সেই খেজুর খাওয়ানোর কিছুক্ষনের মধ্যে বাচ্চা হয়ে গেলে তিনি অত রাতে হুযুরকে তা জানান নি। পরে ফজরের সময় জানালে হুযুর বলেন, তাঁকে রাতেই জানালে তিনি বাকি সময় আরামে তাদের মত ঘুমাতে পারতেন। কারন  তিনি সারা রাত জেগে দোয়া করেছেন।  

খ) হুযুর (আইঃ) এর কাছে এক মহিলা তার ছোট ছেলের নামের আবেদন করে দোয়া চান। কিন্তু নাম আসার পূর্বে সন্তান হলে তার নাম পিতামাতা  রাখেন নাবিদ আহমদ। এর ২০ দিন পর যখন হুযুরের পক্ষ থেকে নাম আসে সেই নামটি ছিল নাবিদ আহমদ। তখন সেই মহিলার হৃদয় খোদার কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল এনং খুশি হলেন।  

গ) হুযুর (আইঃ) এর দোয়া কবুলিয়তের আরেকটি ঘটনা, কাবাবির জামাতের আমির সাহেব তার ছোট ছেলে যার বয়স ১২ বছর ছিল। তার হার্টে ব্লকেজ তৈরি হয় যা অপারেশন করাতে হবে তা বিপদজনক। সব টেস্টের রিপোর্ট আমেরিকায় পাঠানো হলেও ডাক্তাররা একই কথা বলেন। পরে তিনি হুযুর (আই:) এর সাথে অপারেশনের পূর্বে সাক্ষাত করেন এবং তার বাসনা ছিল হুযুর মসিহ মাউদ (আঃ) এর আংটি ছেলের বুকে রেখে দোয়া করবেন। তিনি দোয়ার আবেদন করলে খলিফার প্রতি আদবের কারনে তাঁর মনোকামনা খুলে বলতে পারেন নি। হুযুরের দোয়া করে ফেরার পথে তিনি পুনরায় ডাক দিলেন এবং ছেলের শার্টের বোতাম খুলে মসিহ মাউদ (আঃ) এর আংটি বুকে রেখে দোয়া করলেন। এরপর আমীর সাহেব স্বস্তি বোধ করলেন যে এবার তার ছেলের কিছুই হবে না। তিনি দেশে ফিরে গেলে ডাক্তাররা দেখেন ছেলের আর কোন রোগ নেই, সে সুস্থ। যা খেলাফতের দোয়ার বরকতে হয়েছে।     

                       খালিফাকে হাম হ্যাঁ

                      খালিফা হামারা 

                ওঁ দিল হ্যাঁ হামারা, আঁকা হামারা।।

৮) খেলাফত আমাদের জন্য নিরাপদ দুর্গঃ খেলাফত আমাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বিশ্বব্যাপী মানুষের প্রানহানি, সংঘর্ষ লেগেই আছে। হযরত উমর (রাঃ) এর যুগে পারস্যে অভিযান করতে হয়েছিল। সেনাপতি বার্তা দিয়ে পাঠালেন, আমাদের সামনে একটি নদী রয়েছে। আপনি অনুমতি দিলে বাকি অংশটি জয় করে নিতে পারি। হযরত উমর বললেন, আর নয়, আমরা আর দখল চাই না, মানুষের রক্ত চাই না, শান্তি চাই।

আরেকবার ফিলিস্তিনে যুদ্ধের সময় শত্রু পক্ষ কেল্লা থেকে খবর পাঠালেন যে খলিফা উমর যদি আসেন তবে তারা আত্মসমর্পণ করবে। সংবাদ পেয়ে তিনি ছুটে আসলেন। নামাজের সময় হল, হেকেলে সুলায়মান- অর্থাৎ টেম্পলের ভেতর নামাজের জন্য বললে সেখানে তিনি না পরে সেই দেয়ালের বাইরে একটি জায়গা পরিষ্কার করে নামাজ পরেন। কারন পরে যদি তারা মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ করে সেখানে।

খেলাফতের ছায়াতলে কঠিন থেকে কঠিন বিপদেও উম্মতরা সুরক্ষিত থাকে। ১৯৩৪, ১৯৫৩, ১৯৭৪, ১৯৮৪ কোন সালেই আহমদিয়াতের শত্রুরা নিরবে বসে নাই। কিন্তু আমরা সব জায়গায় নিরাপদ রয়েছি।

১ম খলিফা বলেন, কেউ যদি মুরতাদ হতে চায় তো হোক, খোদা তায়ালা এর পরিবর্তে আমাকে এক জামাত দিবেন। একজন ফিরে গেলে একটি দল আসবে। এর ফলে বিরোধীরা দমে গেল, নিষ্ঠাবান আহমদিরা সংশোধিত হল। মাথা ছাড়া যেমন কোন মানুষ বাঁচতে পারে না তেমনি খলিফা ছাড়া উম্মতে মোহাম্মদীয়া চলতে পারে না।

৯) বিশ্ব শান্তির অগ্রপথিকঃ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস বাদের জন্ম দিয়ে তারা বিশ্ব শান্তি বজায় রাখতে অপারগ হচ্ছে, পরিস্থিতি দিন দিন খারাপই হচ্ছে। এ বিষয়ে দিক নির্দেশনা লাভের জন্য তারা হুযুর (আইঃ) কে রাষ্ট্রীয় সম্মান দিয়ে পার্লামেন্টে বক্তব্য রাখার আমন্ত্রন জানান। এর ফলশ্রুতিতে তিনি ৩০ টি দেশের ৩৫০ জন সদস্যদের উপস্থিতিতে বক্তব্য দেন। এই বক্তব্য এর মাধ্যমে তাদের ভুল ত্রুটি গুলো দেখিয়ে দেন এবং ইসলামের সুন্দর শিক্ষা তুলে ধরেন। পাশ্চাত্যের মানুষ হুযুর (আইঃ) কে Man of peace বলে আখ্যায়িত করেন এবং বিভিন্ন শহরের চাবি হুযুরের হাতে তুলে দেন। তারা অকপটে স্বীকার করেন এই বক্তব্যের শিক্ষাই উত্তম।

হুযুর (আইঃ) বলেন, “ দুনিয়ার এমন কোন জায়গা নেই যেখানে রাতে ঘুমানোর আগে কল্পনায় না পৌঁছাই, আর জাগ্রত অবস্থায় তাদের জন্য আমি দোয়া না করি।।”

সহজভাবে বলতে চাই যে তওহীদ প্রতিষ্ঠা আল্লাহ তায়ালা খেলাফতের মাধ্যমে করতে চেয়েছেন আমরা তার সুফল ভোগ করছি। জামাতে আহমদিয়ার খালাফত চির সবুজ, চির প্রবাহমান, সুগন্ধ ছড়ানোর জিনিষ। এটি এমন গাছ যার শিকর অত্যন্ত দৃঢ়। যার সবসময় বসন্ত বিরাজমান।

হযরত মুসলেহ মাউদ (রাঃ) এর মতে, তোমরা ভালোভাবে স্মরন করবে তোমাদের সকল উন্নতি খেলাফতের সাথে সম্পৃক্ত। যেদিন তোমরা এ কথা বুঝতে অক্ষম হবে এবং খেলাফতকে কায়েম রাখবে না সেদিন তোমাদের ধ্বংস ও সর্বনাশের দিন হবে।আর যদি তোমরা সত্যকে অনুধাবন কর এবং খেলাফতের এ নেযামকে কায়েম রাখো তাহলে যদি সমস্ত পৃথিবী তোমাদের ধ্বংস করতে চায় তবুও তারা তা পারবে না। তোমাদের বিপরীতে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ ও অকৃতকার্য হয়ে থাকবে। যতদিন তোমরা একে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখবে ততদিন পৃথিবীর কোন বিরোধিতাই কার্যকর হবে না।

১০) বিশ্বনেতৃবৃন্দদের শান্তির দাওয়াতঃ খোলাফায়ে রাশিদিনের যুগেও খলিফাগন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের ইসলামের যে দাওয়াত পৌঁছিয়েছেন তারই ধারাবাহিকতা এখনও প্রবাহমান। এই বক্তব্য যখন তৈরি করছিলাম তখন বার বার পরছিলাম যে, হুযুর (আইঃ) রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ব্লাদিমির পুতিন সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দদের কিভাবে বিশ্ব শান্তির আহবানে চিঠি লিখেছেন, দেখছিলাম একজন খলিফা কত দায়িত্ব নিয়ে কত সাবধানতার সাথে বিশ্ব শান্তির আহবান জানাচ্ছেন, মসিহ মাউদ (আঃ) এর ভবিষ্যৎ বানী পূর্ণ করছেন, ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন, যুদ্ধ হলে কতটা ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে তারও আগাম বার্তা তুলে ধরেছেন। এটাই খেলাফতের কল্যাণ। 

আসুন আমরা আমাদের খলিফার জন্য দোয়া করি, “ আল্লাহুম্মা আইয়েদ ইমামানা বি রুহুল কুদুস ওয়া বারিকলানা ফি উমুরিহি ওয়া আমরিহি।”

অর্থঃ হে আমার আল্লাহ! আমার ইমামকে রুহুল কুদুস দ্বারা সাহায্য কর এবং তাঁর কর্ম ও আয়ুতে বরকত দান কর।